লায়ন মো. শামীম সিকদার
বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুত বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন ব্যবহারে নতুন দিগন্ত উন্মেচিত হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। সর্বত্রই লেগেছে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। সব কার্যক্রমেই দেখা যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। কৃষক এখন মাঠে বসেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে পাচ্ছেন কৃষি-সংক্রান্ত সব সেবা ও পরামর্শ। প্রত্যন্ত পল্লীর নববধূ স্কাইপে কথা বলছেন তার প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে। সরকারের সব নাগরিক সেবা হয়েছে ডিজিটালাইজড। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সমান অধিকার ও সুযোগ দিয়ে নারীদের সামাজিক অবস্থানকে আরো উন্নত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে অবদান রাখছে তথ্যপ্রযুক্তি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার মহৎ উদ্যোগ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, যদি তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষমতা ও দক্ষতার সাহায্যে নারীর ক্ষমতায়ন উদ্যোগকে গুণগত ও পরিমাপযোগ্যভাবে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া যায়।

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এসব কার্যক্রমে গ্রামীণ জনপদের পিছিয়ে থাকা নারীরা এখনো তেমনভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেননি। এসব সুবিধাবঞ্চিত গ্রামের অসহায়, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত কিংবা কম সুবিধাপ্রাপ্ত নারীর তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং তাদের তথ্যপ্রযুক্তির সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মহিলা সংস্থা ‘তথ্য আপা’। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন নামে একটি প্রকল্প করা হয়েছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ শ চুয়াল্লিশ কোটি নব্বই লাখ চুয়াত্তর হাজার টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৪৯০টি উপজেলায় একটি করে তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব তথ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে তথ্যকেন্দ্রের তথ্যসেবা, ডোর টু ডোর তথ্যসেবা এবং উঠান বৈঠকমুক্ত আলোচনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিটি তথ্যকেন্দ্রে একজন তথ্যসেবা কর্মকর্তা ও দুজন তথ্যসেবা সহকারী তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদানের কাজে নিয়োজিত আছেন। তারাই গ্রামীণ নারীদের কাছে তথ্য আপা হিসেবে পরিচিত। তথ্য আপারা তথ্যকেন্দ্রে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, উপজেলার সরকারি সেবাসমূহের সহজলভ্য নিশ্চিতকরা, ভিডিও কনফারেন্স, ই-লার্নিং, ই-কমার্স ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন। এ ছাড়া তথ্য আপারা ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে প্রকল্প আওয়াতাধীন সেবা গ্রহীতার বাড়িতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, ব্যবসা, জেন্ডার এবং কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন তথ্যসেবা প্রদান করছেন।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-এসডিজির ৫ নম্বর অভীষ্ট, বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০২১ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন দেশের সার্বিক অগ্রগতির অন্যতম শর্ত। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। গ্রামীণ নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে তথ্য আপা প্রকল্প সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নারীদের তথ্য দুনিয়ায় প্রবেশ করাতে এবং তাদের তথ্যপ্রযুক্তির সেবা প্রদান নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে। তাই এ প্রকল্পের মাধ্যমে এক কোটি গ্রামীণ নারীকে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে পারদর্শী করে গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া ই-কমার্সে সহায়তা করা এবং ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দল গঠন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে গ্রামাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত এক কোটি মহিলাকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা।

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১৩টি তথ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৯ জন গ্রামীণ মহিলাকে তথ্যসেবা প্রদান এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ২৫ হাজার ৩২৩ জন গ্রামীণ মহিলাকে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক কার্যক্রমে সচেতন করা হয়। ওয়েব পোর্টাল, তথ্যভা-ার, উইমেন টিভি, এমআইএস সফটওয়্যার, মোবাইল এপ্লিকেশন এবং কল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রথমপর্যায়ের কাজে সফলতা অর্জন হওয়ায় এর ধারাবাহিকতায় দেশের ৫৯০টি উপজেলায় তৃণমূল নারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে পাঁচ বছরমেয়াদি, তথ্য আপা : ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে তথ্য সেবাকেন্দ্রে একজন তথ্যসেবা অফিসার, দুজন তথ্যসেবা সহকারী ও একজন অফিস সহায়ক পদায়ন করা হযেছে। এর মধ্যে অফিস সহায়ক ছাড়া সবাই মহিলা। মহিলাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য মহিলাকর্মী নিয়োগ একটি উত্তম সিদ্ধান্ত। তথ্য সেবাকেন্দ্রে তিনটি ল্যাপটপ, একটি ডেক্সটপসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তত্ত্বা¡বধানে তথ্য সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তথ্য সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে নারীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার ও ওয়েবসাইট ব্রাউজ সম্পর্কে সচেতন করা হয়। এ ছাড়াও স্কাইপে কথা বলা, পরীক্ষার ফলাফল দেখা, চাকরি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা, সরকারি সেবা সম্পর্কে অবহিত করা, সরকারি সেবা প্রদানকারী অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেবা প্রদান নিশ্চিত করা হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে গ্রামীণ নারীদের সচেতন করা হয়। এ তথ্য সেবাকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে ওজন মাপা, প্রেশার মাপা ও ডায়াবেটিস মাপা হয়। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্রে নারী-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যু, অভিযোগ, মতামত, স্থানীয় সমস্যা ইত্যাদির রেকর্ড রেখে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা-সংক্রান্ত রেকর্ডবুক সংরক্ষণ করা হয় এসব তথ্যকেন্দ্রে।

প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়ে একটি সমৃদ্ধ তথ্যভা-ার গড়ে তোলা হয়েছে। শুধু নারীদের জন্য এ প্রকল্প গ্রামীণ জনপদের সুবিধাবঞ্চিত নারীগোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা কিছুটা দক্ষতাসম্পন্ন এবং যাদের মধ্যে উদ্যোগী মনোভাব বিদ্যমান, তারাই হচ্ছেন তথ্যভা-ারের প্রধান সেবাগ্রহীতা। তবে সাধারণভাবে তথ্যভা-ারের সেবা সব নারীর জন্যই উন্মুক্ত। স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিষয়ক তথ্য, রান্নাবিষয়ক অথবা দৈনন্দিন জীবনের নানা দরকারি তথ্য, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা, শিশুবিষয়ক নানা তথ্য, চাকরি অনুসন্ধান ইত্যাদি সব ধরনের তথ্যের জন্য এই নারীগোষ্ঠীর সামনে তথ্যভা-ারের দুয়ার থাকছে খোলা। তথ্যকেন্দ্রের ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতা হলো সেসব নারী যারা তথ্যকেন্দ্রের আশপাশের এলাকাতেই অবস্থান করেন এবং ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত। তথ্যভা-ার তৈরির মাধ্যমে এক বিপুল জ্ঞানভা-ার সবার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ নির্বিশেষে সবাই এই জ্ঞানভা-ার ব্যবহার করে একদিকে নিজেদের সমৃদ্ধ রতে পারছেন, একই সঙ্গে দেশের নারী উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের একটি সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে কাজ করবে এই তথ্যভা-ার।

প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়ের অনলাইন কার্যক্রমসমূহ, ওয়েব পোর্টাল, তথ্যভা-ার, তথ্য আপা, আইপি টিভি, এমআইএস সফটওয়্যার, কম্পিউটারসহ অন্য সরঞ্জাম জাতীয় মহিলা সংস্থার হেফাজতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। প্রকল্প শেষে এসব অনলাইন কার্যক্রমসমূহ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়ে পদ সৃষ্টি করা হবে। প্রকল্প মেয়াদ শেষে তথ্য আপা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলা ও উপজেলা অফিসের মাধ্যমে অব্যাহত রাখা হবে। বর্তমানে ৬৪টি জেলা এবং ৫০টি উপজেলায় জাতীয় মহিলা সংস্থার অফিস রয়েছে। অবশিষ্ট উপজেলায় জাতীয় মহিলা সংস্থার অফিস প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। প্রকল্পের সাসটেইনিবিলিটি নিশ্চিতকরণে মাইন্ড ইন্সপায়ার টু ন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট দল গঠন এবং ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোগী মহিলাদের বিশেষভাবে গড়ে তোলার পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে।

পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা এবং তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক ডিভাইসের ব্যবহার সম্পর্কে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য ‘তথ্য আপা’ প্রকল্প কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। নারীদের অধিকাংশই বসবাস করেন গ্রামে। গ্রামের নারীরা এখনো মূল স্রোত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। তাই এসব নারীর তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে নিয়ে আসার জন্যই ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের কার্যক্রম। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করতে পারলে ডিজিটাল বাংলাদেশ টেকসই ও মজবুত হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Share.

About Author

Leave A Reply